চেজ ডিজ-অনার মামলা করতে যে সকল বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে- গোবিন্দ চন্দ্র দাস

জেনে নিন কিভাবে সঠিকভাবে চেজ ডিজঅনার করতে হবে, চেকের এমাউন্ট কোনটা হবে, কিভাবে কনসিডারেসন প্রমাণ করতে হবে!

চেক ডিজঅনার (প্রতীকী ছবি)
চেক ডিজঅনার (প্রতীকী ছবি)

সাধারণত গ্রাহক যখন ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয় বা খেলাপীতে পরিণত হয় তখন ঋণ দাতা- ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিকিউরিটি চেকটি ডিজঅনার করে মামলা দায়ের করে থাকে। ঋণ দাতা- ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক চেক নেওয়া বা ডিজঅনার করে মামলা করা সংক্রান্ত বিবাদ-বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। প্রায়শই এই বিষয় নিয়ে আইন আদালতে বাদ-বিসম্বাদ হচ্ছে। আসুন আমরা এই বিষয়টির উপর আজ আলোকপাত করি।

সিকিউরিটি চেক কী:
ঋণ পরিশোধের শর্ত স্বরুপ ঋণ গ্রহীতা-গ্রাহক কর্তৃক ঋণ দাতা- ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান বরাবর যে চেক জামানত হিসেবে প্রদান করা হয় তাকে সিকিউরিটি চেক বলে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সিকিউরিটি চেক গ্রহণের বিষয়টি কি বৈধ?
এক কথায় উত্তর হলো – হ্যাঁ।
নেগোসিয়েবল ইন্স্ট্রুমেন্ট এ্যাক্ট, ১৮৮১ বা ব্যাংক কোম্পান আইন, ১৯৯১ ইত্যাদির কোথাও আসলে এই সংক্রান্ত আলোচনা নাই। এইটা মূলত প্রথাভিত্তিক আইন। দীর্ঘদিনের রীতি অনুযায়ী চলে আসছে। ব্যক্তিগত পর্যায়েও এর প্রচলন আছে। কেউ ঋণ গ্রহন করলে জামানত হিসেবে ঋণ দাতাকে চেক প্রদান করে। একইভাবে অনেক দিন থেকেই ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান তার ঋণ গ্রাহকদের নিকট হতে জামানাত হিসেবে চেক রাখে। এই রীতিসিদ্ধ প্রথাটাকে আস্তে আস্তে নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আনা হয়। সেক্ষেত্রে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের রেগুলেটরী কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু গাইডলাইন এবং সার্কুলার জারি করে। প্রথমে দুইটি গাইডলাইন করা হয় – PRUDENTIAL REGULATIONS FOR SMALL ENTERPRISES FINANCING  এবং PRUDENTIAL REGULATIONS FOR CONSUMER FINANCING । উক্ত গাইডলাইন দুটির বিষয়ে সার্কুলারটি হলো- BRPD Circular No.07 , যা জারি করা হয় ২০০৪ সালের নভেম্বর মাসের ০৩ তারিখ। উক্ত গাইডলাইন দুটিতে প্রথমবারের মতো জামানত হিসেবে চেক রাখার বিধানটি বিবৃত হয়। সেই সময় থেকে কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতি কিস্তির বিপরীতে একটা করে অথবা প্রতি ০৬ মাসের জন্য বা ০৬ কিস্তির জন্য একটা করে এবং একটি করে মাস্টার চেক (যাহা সুদসহ সম্পূর্ণ ঋন কাভার করে ) রাখা হতো। এমনকি PRUDENTIAL REGULATIONS FOR CONSUMER FINANCING -এ Unsecured Personal Loan এর ক্ষেত্রে সিকিউরিটি হিসেবে ব্ল্যাংক চেক ও রাখার সুযোগ ছিল।

পরবর্তীতে দেখা গেল যে ব্যাংকগুলো সব ধরণের ঋণের ক্ষেত্রেই জামানত হিসেবে ব্ল্যাংক চেক রাখছে বা ঋণ-গ্রাহক অসাবধানতা বশতঃ বা অজ্ঞতাবশতঃ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে জামানত হিসেবে ব্ল্যাংক চেক দিচ্ছে। যেহেতু ব্ল্যাংক চেক জামানত হিসেবে রাখা আইনতসিদ্ধ নয়, সেকারণে এসব নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। ফলে ২০১৭ সালের ফেব্রæয়ারী মাসে ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি এন্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক এফআইসিএসডি সার্কুলার লেটার নং-০১ ইস্যু করা হয়। সেখানে চেক সংক্রান্ত প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতি বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণ বা বিনিয়োগের বিপরীতে ফাঁকা চেক জামানত হিসেবে গ্রহণ না করার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে একই বছরের মে মাসে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ বিআরপিডি সার্কুলার নং -০৮ জারি করে Prudential Guidelines for Small Enterprise Financing এর এতদ্বসংক্রান্ত বিধির পরিবর্তন করে। উক্ত সার্কুলার নং- ০৮ দ্বারা উক্ত গাইডলাইনের রেগুলেশন নং ১৩ এর পর নি¤œরুপ রেগুলেশন নং-১৪ সংযুক্ত করা হয়:

“Regulation: 14 Procedure of Loan Repayment For the purpose of smooth repayment procedure against disbursed loans, Banks are advised to follow the procedure as follows:

  • A letter of authority from the client(s) shall be taken for debiting client(s) account for repayment of loan installment(s) as per loan agreement.
  • A memorandum of deposit of Cheque shall be taken from the concerned client.
  • Fully prepared and valid signed postdated cheques shall be taken for each installment stipulating amount and date as per repayment schedule.”

অর্থাৎ Small Enterprise Financing এর ঋণের ক্ষেত্রে তার পর থেকে আর ফাঁকা চেক রাখার সুযোগ থাকছে না। যদিও কাগজে কলমে এখনো CONSUMER FINANCING এর ক্ষেত্রে ব্ল্যাংক চেক রাখার সুযোগ এখনো আছে বিশেষত Unsecured Personal Loan এর ক্ষেত্রে। যদিও সর্বশেষ সার্কুলারদুইটি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, ব্যাংলাদেশ ব্যাংক সব ধরণের ঋণের ক্ষেত্রেই ব্ল্যাংক চেক না গ্রহন করার পক্ষে। ব্যাংলাদেশের সমস্ত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের রেগুলেটরী কর্তৃপক্ষ হলো- বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত যে কোন সার্কুলার যেকোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য আইনের সমতুল্য। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ব্ল্যাংক চেক রাখার বিষয়ে অনুৎসাহিত করা হলেও জামানত হিসেবে কিস্তির সমপরিমাণ চেক রাখা বা কোন কোন ক্ষেত্রে একটি মাস্টার চেক রাখতে আইনত কোন বাধা নেই।

সিকিউরিটি চেক কখন ডিজঅনার করবেন?  
প্রতি কিস্তির জন্য একটি করে সিকিউরিটি চেক রাখা থাকলে কিস্তির নির্ধারিত তারিখের পরে যেকোন দিন এমনকি এক দিন পরও চেক টা ডিজঅনার করতে আইনত কোন বাধা নেই। যেহেতু চেকের গায়ে যে তারিখ দেয়া থাকে সেদিন থেকে সর্বোচ্চ ০৬ মাস চেকের মেয়াদ থাকে, যেহেতু উক্ত মেয়াদের মধ্যে চেকটি যে কোন দিন এমনকি একাধিক বার ডিজঅনার করা যায়। ডিজঅনার না বলে প্রাথমিকভাবে নগদায়নের জন্য প্লেস করা যায় বলা যায়। নগদায়নের জন্য প্লেস করলে উক্ত চেকটি নানা কারণে ডিজঅনার হতে পারে। যেকোন কারণে ডিজঅনার হলেই তা নেগোসিয়েবল ইন্স্ট্রুমেন্ট এ্যাক্ট, ১৮৮১ এর ১৩৮ ধারার বিধান মোতাবেক একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। যদি প্রতি ০৬টি মাসিক কিস্তির জন্য একটা চেক থাকে তাহলে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি মাত্র চেকই বৈধ থাকবে। উক্ত চেকই ডিজঅনার করতে হবে। আবার যদি মাস্টার চেক হয়, তাহলে সেটাও ডিজঅনার করতে পারেন।

কখন কোন চেকটি ডিজঅনার করবেন?
অনেক সময় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মকর্তাই বুঝতে পারেন না যে কোন চেকটি আসলে ডিজঅনার করতে হবে। ০১ (এক) মাসিক কিস্তির সমপরিমাণ চেক নাকি ০৬ (ছয়) মাসিক কিস্তির সমপরিমাণ চেক নাকি মাস্টার চেক। এক্ষেত্রে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্র্যাকটিসের পার্থক্য আছে। কেউ কেউ এক কিস্তি বকেয়া পরলেই চেক ডিজঅনার মামলা করে (যদি প্রতি কিস্তির জন্য একটি করে সিকিউরিটি চেক থাকে)। কেউ কেউ ০৬ মাসিক কিস্তির সমপরিমাণ চেক ডিজঅনার করে যদি ০৬ মাসের বা তার বেশি বকেয়া জমে যায়। আবার কেউ কেউ মাস্টার চেক ডিজঅনার করে মামলায় চলে যায়। মাস্টার চেক এ কোন এমাউন্ট বসবে, সেটা নিয়েও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাগণ দ্বিধা- দ্বন্দে¦ থাকেন।

মাস্টার চেক-এ কোন এমাউন্ট বসবে?
মাস্টার চেক এ শুধু মাত্র তারিখ ছাড়া বাকিটা পূরণ করা অবস্থায় থাকার কথা। কেননা চেকটি ঋন অনুমোদনের সময়েই মঞ্জুরীপত্রের শর্ত মোতাবেক ঋণ গ্রহীতা কর্তৃক প্রদান করা হয়ে থাকে। আর বেশিরভাগ মঞ্জুরীপত্রে মাস্টার চেক সংক্রান্ত শর্তটি থাকে যে, One master cheque covering full limit  অথবা One master cheque covering limit with full interestআর এই মাস্টার চেকটিতে কোন তারিখ থাকে না। যখন ঋণটি খেলাপীতে পরিণত হয় সাধারণত তখনই এই চেকটি ব্যবহার করা হয়। সাধারণত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফাইনাল নোটিশ বা চ‚ড়ান্ত নোটিশ প্রদানের মাধ্যমে ঋণটি কল ব্যাক করে থাকে। অর্থাৎ ঋণ সুবিধাটি বাতিল কওে তখন সমগ্র আউটস্ট্যান্ডিং এমাউন্টটা ফেরত দিতে ঋণ-গ্রহীতাকে নোটিশ দেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কলব্যাক করে তারপর মাস্টারচেকটি নগদায়নের জন্য প্লেস করা হয়। এক্ষেত্রে একটা বাস্তব সমস্যা দেখা দেয় আর তা হলো- মাস্টারচেকটির এমাউন্ট কত হবে? আউটস্ট্যান্ডিং এমাউন্ট নাকি লিমিট নাকি লিমিটের সাথে সুদসহ। যে কোন সিকিউরিটি চেক মঞ্জুরীপত্রের শর্ত মোতাবেক ঋণ-গ্রহীতা কর্তৃক পূরণ করে দেয়ার কথা থাকলেও, অসাবধানতা বশতঃ বা অজ্ঞতাবশতঃ বা তাড়াহুড়ো করে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে জামানত হিসেবে ব্ল্যাঙ্ক চেক প্রদান করে। কেননা ঋণ গ্রহণের সময় গ্রহীতাগণ খুবই উতলা থাকেন, অতি উৎসাহী থাকেন। অনেকেই অনেক ভাবে তোষামোদি করেন, যা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার কথা তাও দেন আবার যা দেয়ার কথা না অনেক সময় তাও দিয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিজনেস টার্গেট পূরণ করার চাপে তাড়াহুড়ো করা, বসকে সন্তুষ্ট করা, অনর্থক আলসেমি করা বা অজ্ঞতাবশতঃ সাথে সাথে পূরন না করে নেওয়া প্রভৃতি নানা কারণে মাস্টারচেকটি পূরণ করা হয়ে উঠে না। তা আসলে ফাঁকা বা ব্ল্যাংকই রয়ে যায়। সাধারণত ঋণটি খেলাপী হলে বা মামলা করার প্রয়োজন হলে তখন তারা বিষয়টা নিয়ে ব্যস্ত হয়।

Alauddin vs State মামলায় মহামান্য আপিল বিভাগ মতামত প্রদান করেন যে, ব্ল্যাংক চেক রাখা যাবে না, কিন্তু কোন বৈধ কারণে (ঋণ থাকলে) যদি একটা ব্ল্যাংক চেক রয়েই যায় এবং তা ডিজঅনার হয়, তাহলে সেটাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে অর্থাৎ সেক্ষেত্রেও চেক ডিজঅনার এর মামলা চলবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, নিরুৎসাহিত করা হলেও ফাঁকা বা ব্ল্যাংক চেক থাকলে তা দিয়ে মামলা চলবে। তবে বিতর্ক এড়িয়ে চলতে ব্ল্যাংক চেক না রাখাই ভালো। সেক্ষেত্রে ফাঁকা বা ব্ল্যাংক চেকটি মঞ্জুরীপত্র মোতাবেক পূরণ করে মামলা করাই সঙ্গত হবে। সেক্ষেত্রে memorandum of deposit of Cheque নামক চার্জ ডকুমেন্টটি পূরণ করে নেয়া ভালো। memorandum of deposit of Cheque নামক চার্জ ডকুমেন্টটিতে থাকে চেক এর নাম্বার, ব্যাংকের নাম, টাকার পরিমাণ, তারিখ, গ্রহীতার স্বাক্ষর প্রভৃতি। মাস্টার চেকটির ক্ষেত্রে কোন তারিখ থাকবে না। যদি মঞ্জুরীপত্রে প্রতি কিস্তির জন্য একটা চেক নেয়ার কথা থাকে তাহলে, পেমেন্ট শিডিউল অনুযায়ী প্রত্যেক কিস্তির জন্য নির্ধারিত তারিখের একটা করে চেক থাকবে এবং চেকে কিস্তির সমপরিমাণ টাকার উল্লেখ থাকবে। যদি ০৬ মাসে বা ০৬ মাসিক কিস্তির জন্য একটা করে চেক থাকে তাহলে প্রতি ০৬ টা কিস্তির তারিখ পর পর একটা করে চেক থাকবে অর্থাৎ ৬ষ্ঠ কিস্তির তারিখে একটা, ১২তম কিস্তির তারিখে একটা ১৮তম কিস্তির তারিখে একটা এভাবে চেক থাকবে এবং চেক এ ৬ কিস্তির সমপরিমাণ টাকার উল্লেখ থাকবে। এভাবে কিস্তি চেকগুলোতে তারিখসহ টাকার পরিমাণ উল্লেখ থাকবে। এবার আসা যাক মূল কথায়। যদি সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত হয় যে মাস্টার চেক ডিজঅনার করে মামলা করা হবে, তাহলে সমস্যাটা দেখা যায় চেক এর এমাউন্ট বসানো নিয়ে। মাস্টার চেক এ তারিখ উল্লেখ থাকবে না। মঞ্জুরীপত্র মোতাবেক শুধু টাকার উল্লেখ থাকবে। যদি তা ব্ল্যাংক থাকে, তাহলে এক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয় চেক এর এমাউন্ট কত হবে তা নিয়ে। অনেকে মঞ্জুরীপত্রে উল্লেখিত লিমিট বসায় আবার অনেকে আউটস্ট্যান্ডিং এমাউন্ট বসায়। আউটস্ট্যান্ডিং এমাউন্ট বসানোর পিছনের ভাবনাটা কী থাকে? সেটা হলো- ব্যাংক পাবে ১৫০ টাকা, তাহলে চেক ডিজঅনারের মামলাও তো ১৫০ টাকারই হওয়া উচিত। কম হবে কেন? আসলে এভাবে ভাবার সুযোগ নেই। মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়েছে যে চেক ডিজঅনারের মামলায় অবশ্যই কনসিডারেশন প্রমাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে ঋণ গ্রহীতা যে ব্যাংকের নিকট হতে ঋণ গ্রহণ করেছেন সেটাই কনসিডারেশন। সেটার প্রমাণপত্র তথা ঋণ মঞ্জুরীপত্রই কনসিডারেশনের প্রমাণপত্র। ঋণ গ্রহীতা যদি উক্ত মঞ্জুরীপত্র অস্বীকারও করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট একাউন্টটির স্টেটমেন্ট দিলেই প্রমাণ হয়ে যায় যে উক্ত ব্যক্তিই ঋণ গ্রহীতা। আর যেহেতু সিকিউরিটি চেক নেয়ার ভিত্তিই হলো মঞ্জুরীপত্র। আর এই মঞ্জুরীপত্রের নির্দেশনা মোতাবেক চেক রাখাই সঙ্গত। সেক্ষেত্রে মাস্টার চেক সংক্রান্ত নির্দেশনাটি হলো One master cheque covering full limit  অথবা One master cheque covering limit with full interest । তাই আলোচ্য বø্যাংক মাস্টারচেকে আউটস্ট্যান্ডিং এমাউন্ট লেখার সুযোগ নেই। অবশ্যই তা লিমিট হবে অথবা লিমিট + পূর্ণ সময়কালীন সুদসহ এমাউন্টটি হবে। আরেকটা বিষয় না বললেই নয়, তা হলো- ঋণদাতা ব্যাংক প্রয়োজনে চেকটি পূরণ করে নিতে পারবে। তবে তা অবশ্যই মঞ্জুরীপত্রের শর্ত মোতাবেক হতে হবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নাই। স্বেচ্ছাচারিতা করে যে কোন এমাউন্ট বসানোর সুযোগ নাই। মঞ্জুরীপত্রের আলোকে তা পূরণ করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে সবথেকে ভালো প্র্যাকটিস হলো- যখন ক্লায়েন্ট বা ঋণগ্রহীতা চেকগুলো স্বাক্ষর করে দিচ্ছে, তখনই চেক এর বাকি অংশগুলো তথা- তারিখ, এমাউন্ট পূরণ করে নেয়া ভালো। কাস্টমার বা গ্রাহকের অনুমতিতে ঋণদাতার চেক পূরণ করে নিতে আইনগত কোন বাধা নেই। এক্ষেত্রে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের একটা রায় আছে যা ৬৮ ডিএলআর(এইচডি), ২২৮- তে রিপোর্টেড।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে আলোচনা করে রাখা দরকার তা হলো- যখন ঋণটি খেলাপীতে পরিণত হবে, তখন আসলে আউটস্ট্যান্ডিং এমাউন্টটি লিমিটের চেয়ে বেশিও হতে পারে আবার কমও হতে পারে। কম বেশি যেটাই হোক না কেন আইন মোতাবেক কোনভাবেই আউটস্ট্যান্ডিং এমাউন্ট বসানো যাবে না। সব সময়ই লিমিট বসিয়ে মামলা করতে হবে।

এবার আসুন যদি আউটস্ট্যান্ডিং এমাউন্ট যদি লিমিটের কম হয় তাহলে ব্যাপারটা কী হয়? ধরুন ব্যাংক ০৫ বছর আগে ঋণ প্রদান করেছিল ১০০ টাকা। কতকগুলি কিস্তি শোধ করার পর বর্তমানে বকেয়া বা আউটস্ট্যান্ডিং আছে ৫০ টাকা। এক্ষেত্রে করণীয় কী? ঋাবছেন ৫০ টাকা যেহেতু বকেয়া আছে, তাহলে চেকে ৫০ টাকা বসালেই চলে! কিন্তু না। তার কোন সুযোগ নাই। কেননা মঞ্জুরীপত্র একটা চুক্তিনামা। চুক্তিনামার বাইরে গিয়ে চেকে এমাউন্ট বসানোর সুযোগ নাই। কোনভাবেই নাই। আইনগতভাবে বৈধ হবে না। ব্যাংক তো চেক রাখছেই মঞ্জুরীপত্র অনুযায়ী। সুতরাং মঞ্জুরীপত্র বা চুক্তিনামায় যা আছে তার বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নাই। আর মঞ্জুরীপত্রে কী আছে? মাসিক কিস্তি চেক ১টা করে অথবা প্রতি ০৬ মাসে ১টা করে এবং সেই সাথে একটা মাস্টারচেক। তাহলে ১০০ টাকার ঋণে ৫০ টাকা বকেয়া থাকলেও আসলে ৫০ টাকা বসিয়ে মামলা করার সুযোগ নেই। হয় কিস্তি চেক দিয়ে মামলা করতে হবে অথবা মাস্টারচেক (লিমিট-চেক) দিয়ে মামলা করতে হবে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, আউটস্ট্যান্ডিং বা বর্তমান বকেয়া যেটাই হোক না কেন ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান/ঋণদাতাকে সব অবস্থাতেই হয় কিস্তি চেক (০১ অথবা ০৬ মাসের কিস্তির সমপরিমাণ) অথবা লিমিট দিয়ে মামলা করতে হবে।

আইনের দর্শনগত আলোচনাঃ

এই সংক্রান্ত আইনের দর্শনগত দিক থেকেও বিষয়টা আলোচ্য হতে পারে। সেটা হলো চেক ডিজনার একটা কোয়াজাই ক্রিমিনাল ন্যাচারের হওয়া স্বত্তে¦ও আমাদের দেশের আইনে এখন পর্যন্ত তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় (সম্ভবত এদেশের ঋণগ্রহীতাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের বদ-খাসলতকে মাথায় রেখে এটাকে পূর্ণাঙ্গ অপরাধ হিসেবে আইনে স্থান দেয়া হয়েছে)। বিশ্বের অনেক দেশেই এটা দেওয়ানী মোকদ্দমা হিসেবে গন্য হয়। যাইহোক, যেহেতু আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত এটা অপরাধ সুতরাং এর বাইরে প্র্যাকটিস করার সুযোগ নাই। যেহেতু চেক ডিজ-অনার একটা অপরাধ সুতরাং তার শাস্তি হতে হবে। একারণে এই অপরাধের বিচারের জন্য আমরা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বিচার দেই। ফলে পাওনা বেশি বা কম থাকার সাথে চেক এর এমাউন্ট বসানোর কোন সম্পর্ক নাই। চেক এর এমাউন্ট মঞ্জরীপত্রের শর্ত মোতাবেক হতে হবে। ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান/ঋণদাতা গ্রাহকের নিকট কত টাকা প্রাপ্য এটা আদালতের দেখার বিষয় নয়। একটা বৈধ চেক যদি ডিজ অনার হয়- দেশের আইনে তা অপরাধ এবং তার বিচার হবে। ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চেক ডিজ-অনার মামলা করার অন্তরালে খেলাপী ঋণ উদ্ধার উদ্যেশ্য হলেও আইনের দর্শনগত দিক থেকে তা মূলত অপরাধের বিচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এতে অবশ্য বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে ঋণ উদ্ধার হয়ে যায়। ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ হলো বৈধভাবে চেক নেয়া / পূরণ করে নেয়া / আইন মোতাবেক সময়সীমা এবং পদ্ধতি মেনে মামলা করা।

           গোবিন্দ চন্দ্র দাস, ছবিঃ লেখক

লেখকঃ একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের আইন বিভাগে কর্মরত (gobindadas1802@gmail.com)

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*